মালয়েশিয়ায় ঈদুল আজহা, যাকে স্থানীয়ভাবে ‘হারি রায়া হাজি’ নামে অভিহিত করা হয়। মুসলিম সম্প্রদায়ের জন্য এক অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ধর্মীয় উৎসব। এই দিবসটি হজ পালনের স্মৃতিচারণ এবং কুরবানির তাত্ত্বিক তাৎপর্যের মধ্য দিয়ে উদযাপিত হয়। মালয়েশিয়ার প্রেক্ষাপটে এ উৎসব ধর্মীয় বিধান, সামাজিক ঐক্য এবং স্থানীয় সংস্কৃতির অপূর্ব সমন্বয়ে পরিপূর্ণ।ঈদের আমেজকে ঘিরে মালয়েশিয়ার গণমাধ্যমে প্রচারিত হয় বিভিন্ন বিশেষ অনুষ্ঠান, নাটক, আলোচনা ও সংগীতানুষ্ঠান। ঈদের আগে ও পরে সমগ্র দেশজুড়ে বিরাজ করে উৎসবমুখর পরিবেশ। মালয়েশিয়ায় ঈদ উদযাপন একাধারে ধর্মীয় অনুশাসন ও স্থানীয় সংস্কৃতির সম্মিলন। অতিথিপরায়ণতা, ঐতিহ্যবাহী পোশাক, খাবার এবং পারিবারিক মূল্যবোধ—সব মিলিয়ে ঈদ হয়ে ওঠে একটি জাতীয় ঐক্যের উৎসব। পুরুষেরা বাজু মেলায়ু ও সামপিন এবং নারীরা বাজু কুরুং বা কেবায়া পরে ঈদের সাজ সম্পূর্ণ করেন।
এ প্রেক্ষাপটে ওরাং আসলি মুসলিমদের ঈদ উদযাপনেও পরিলক্ষিত হয় তাদের স্বকীয়তা ও ঐতিহ্য। তারা সাধারণত ইসলামিক সংস্থা বা সরকারি সহায়তার মাধ্যমে কুরবানি সম্পন্ন করে। কুরবানির মাংস রান্নার ক্ষেত্রে ওরাং আসলিদের রান্নার ধরণ ভিন্ন ও অনন্য। তারা মূলত প্রাকৃতিক উপাদান এবং বনজ উৎসের ওপর নির্ভরশীল। বাঁশের খোলস ব্যবহার করে তারা মাংস, লবণ, পেঁয়াজ এবং বনজ মসলা—যেমন বুনো আদা, জংলি মরিচ, লেবুপাতা ও সেরাই (লেমনগ্রাস)—সহ ভরে আগুনে সেদ্ধ করে। এই প্রক্রিয়াকে তাদের ভাষায় ‘পাঙ্গান’ বা ‘লেমাং স্টাইল’ বলা হয়। এতে মাংসের স্বাদে আসে এক প্রকার প্রাকৃতিক ঘ্রাণ ও মসৃণতা।
এছাড়াও, তারা কখনো আগুনে সরাসরি মাংস ঝলসে বা ফুটন্ত পানিতে সিদ্ধ করে রান্না করে। আধুনিক মসলা বা প্রস্তুতকৃত মিক্স ব্যবহার না করে তারা সহজলভ্য উপাদান দিয়ে মাংসের প্রাকৃতিক স্বাদ বজায় রাখেন। এই রান্না কেবল খাদ্য প্রস্তুতির প্রক্রিয়া নয়, বরং একটি পারিবারিক-সামাজিক আচার, যেখানে পুরো সম্প্রদায় একত্র হয়ে রান্না ও ভোজনের আনন্দ ভাগ করে নেয়।
মোটকথা, মালয়েশিয়ায় ঈদুল আজহার উদযাপন কেবল একটি ধর্মীয় আচার নয়, বরং সামাজিক সংহতি, সংস্কৃতির গৌরব এবং জাতিগত বৈচিত্র্যের মেলবন্ধন। ধর্মীয় মূল্যবোধের পাশাপাশি স্থানীয় সংস্কৃতির সম্মান ও সংরক্ষণই এই উৎসবকে করে তোলে সত্যিকার অর্থে প্রাণবন্ত ও অর্থবহ।
https://mzamin.com/news.php?news=164839